বাঞ্ছারামপুরে সাড়ে ৩ লাখ মানুষের ৩০ টি কমিউনিটি ক্লিনিক চলছে জোড়াতালি দিয়ে।। পরিত্যক্ত ভবনে চলে মাদকসেবন
- আপডেট সময় : ০৮:৪৮:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৭ বার পড়া হয়েছে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা চলছে রীতিমতো জোড়াতালি দিয়ে।বেহাল দশায় নিমজ্জিত ক্লিনিকগুলোতে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাড়িয়েছে মাদক সেবনের নিরাপদ স্পট হিসেবে।
এছাড়াও এসব ক্লিনিক নানা সমস্যায় জর্জরিত হওয়ায় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। ডাক্তার নেই, ওষুধের সংকট, জরাজীর্ণ ভবন, দরজা-জানালা ভাঙা, রোগীদের মলমূত্র ত্যাগের ব্যবস্থা নেই। এতে করে ১৩টি ইউনিয়নের সাড়ে তিনি তিন লাখ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাঞ্ছারামপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকেরই ভয়াবহ অবস্থা।
সম্প্রতি, কমিউনিটি ক্লিনিকের ভাঙ্গাচুড়া দরজা ভেঙ্গে মুল্যবান সামগ্রী চুরি হওয়ার ঘটনা একাধিক ক্লিনিকে ঘটেছে। থানায় জিডিও করা হয়েছে।প্রতিকার হয়নি।
বাঞ্ছারামপুর সদর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি ( কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাডার) শিরিন সুলতানা অভিযোগ করেন, “তার ক্লিনিকে একাধিকবার চুূরী ও রাত হলে মাদকসেবিদের আড্ডা বসে।কয়েকবার তালা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে।রোগীরা আতংকে ক্লিনিকে প্রবেশ করে না।তাই বাইরে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। তিনি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৫ বছর ধরে ভাঙ্গা ভবনে সেবা দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। এসব কারনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর ৫ বছর আগে ক্লিনিকটিকে পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়।”
সরেজমিনে দেখা গেছে উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অযত্ন আর নিয়মিত তদারকির কারণে সেই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্লিনিকগুলোর ভগ্নদশা দেখে মনে হয়, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বদলে এসব জরাজীর্ণ ভবনের এখন জরুরি ‘চিকিৎসা’ বা সংস্কার প্রয়োজন।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, ১৩টি ইউনিয়নে জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধাপে ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয় । সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিক থেকে গড়ে সাত হাজার মানুষ মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার-পরিকল্পনা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টিবিষয়ক তথ্য ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ পাওয়ার কথা। কিন্তু বহু বছর ধরে সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে অধিকাংশ ক্লিনিকই এখন কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। সদর ইউনিয়নের
মনাইখালী ক্লিনিকটি ভবন পুরোটাই ভেঙ্গে যাওয়ার কারনে তো বন্ধই করে দেয়া হয়েছে।
বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখা যায়, ৩০টি ক্লিনিকের বেশির ভাগই বেহাল দশা। অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, বৃষ্টির দিনে ছাদ চুইয়ে ভেতরে পানি পড়ে মেঝে ভেসে যায়। কোনো কোনো ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে পড়ে গেছে অনেক আগেই। বেশ কিছু ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আবার যেখানে আছে সেখানেও ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে ফ্যান ঝুলানো সম্ভব হচ্ছে না। বেশির ভাগ ক্লিনিকে রোগীদের জন্য খাওয়ার পানির কোনো ব্যবস্থা নেই, শৌচাগারগুলো নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। পর্যাপ্ত বসার জায়গা না থাকায় অসুস্থ মানুষ ও গর্ভবতী নারীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সরবরাহ করা ওষুধের কার্টনগুলোও জরাজীর্ণ ভবনের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে পড়ে রয়েছে।
বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ৪ নং ওয়ার্ডের কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা সালমা খাতুন জানান, অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে সেবা নিতে এসেছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাচ্চার গায়ে খুব জ্বর, ওষুধ নিতে এসেছিলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই গা ছমছম করে। ছাদ থেকে সিমেন্টের টুকরো খসে খসে শরীরে পড়ছে। বৃষ্টি হলে তো দাঁড়িয়ে থাকার উপায় থাকে না, পানি চুইয়ে গায়ে পড়ে। আমরা গরিব মানুষ, শহরে ডাক্তার দেখানোর টাকা নাই বলে এখানে আসছি। কিন্তু এমন ভাঙা ঘরে ডাক্তার-রোগী দুজনেরই তো প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া এসেও লাভ হয় না, কারণ গ্যাস্ট্রিক আর প্যারাসিটামল ছাড়া বেশির ভাগ সময় কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না। এসে শুনি সাপ্লাই শেষ। বাধ্য হয়ে গ্রামের ফার্মেসি থেকে ধারদেনা করে ওষুধ কিনে নিতে হয়।
ছলিমাবাদ ইউনিয়নে চিকিৎসা নিতে আসা আজগর আলী বলেন, আমি জ্বর দেখানোর জন্য এসেছিলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি বসার কোনো ভালো জায়গা নেই। শৌচাগার এত নোংরা যে, ব্যবহার করার উপায় নেই। ডাক্তার নেই, প্রতি সপ্তাহে ডাক্তার এক দিন আসেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিএইচসিপি ( স্বাস্থ্যকর্মী) জানান, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে জেনেও তারা সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় এবং সঠিক সময়ে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কেউ নেই। ক্লিনিকে তালা খোলা থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সবকছিু স্বাস্থ্যকর্মীদের করতে হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার রঞ্জন বর্মন বলেন, ক্লিনিকগুলোর ওষুধ মূলত ট্রাস্ট থেকে সরবরাহ করা হয়। কার্টন আকারে যা বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী বরাদ্দ আসার আগ পর্যন্ত কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয়। বর্তমানে বাঞ্ছারামপুরের ৩০টি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ২৫-২৬টি ভবনই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চাহিদা ও তালিকা পাঠিয়েছি। ৩০ টি ক্লিনকের মধ্যে ২ টি আবার সিএইচসিপি নেই।ফলে রোগীদের সমস্যা হচ্ছে। আমি উপরে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। ক্রমান্বয়ে অতিঝুকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার কাজ শুরু করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
মাদকসেবিদের আড্ডা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এর উত্তর দেননি।
সংবাদটি শেয়ার করুন






















