সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নজরুলের বাড়িতে শোকের মাতম
- আপডেট সময় : ০৬:২০:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ৫৭ বার পড়া হয়েছে
তিন বছর কারাগারে ছিলেন, মরদেহ দেশে ফেরানোর দাবি পরিবারের
পরিবারের অভাব ঘোচাতে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক নজরুল ইসলাম (২৫)। কিন্তু প্রবাসে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর প্রায় তিন বছর সৌদি আরবের কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ছেলের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবার। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা তার বাবা-মা। অন্যদিকে, ভাতিজার মৃত্যুসংবাদ সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার ফুফু।
নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কৃষক পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন নজরুল। সংসারের আর্থিক সংকট দূর করতে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে মক্কায় একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে দেশটিতে যাওয়ার প্রায় ছয় মাসের মাথায় ২০২৩ সালে একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীসহ তাকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। পরে আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর থেকে রিয়াদ ও মক্কার বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ছিলেন নজরুল।
নজরুলের মা রহিমা বেগমের বরাতে জানা যায়, কারাগারে থাকলেও প্রতি রোববার নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন ছেলে। কিন্তু গত সপ্তাহে আর ফোন আসেনি। পরে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। একই ঘটনায় অভিযুক্ত সুইটি আক্তারেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পায় পরিবার।
ছেলের মৃত্যুসংবাদে ভেঙে পড়েছেন বাবা আব্দুল বাছির। সন্তান হারানোর শোকে বারবার বিলাপ করছেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পাননি তারা। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি বলেও তাদের দাবি।
নজরুলের মৃত্যুর খবরের শোক সইতে পারেননি তার ফুফু আবেদা বেগমও। গত ১৪ অক্টোবর রাতে ভাতিজার মৃত্যুসংবাদ শোনার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান বলে জানিয়েছে পরিবার। একের পর এক স্বজন হারিয়ে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।
মরদেহ দেশে ফেরানোর আকুতি
নজরুলের মৃত্যুর পর তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী। তাদের আকুতি, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখে নিজ গ্রামের মাটিতে দাফন করতে পারেন তার বাবা-মা।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন, সৌদির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাদের আটক, বিচার ও শাস্তি কার্যকরের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের দাবি, আইনি সহায়তা নিশ্চিত না করে এবং বাংলাদেশ সরকারকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
এদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট মিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা। বিষয়টি জানার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। আটক দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সৌদি সরকারের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করার বিষয়টি কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের বিধান লঙ্ঘন করেছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্যের আগে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন বলেও জানিয়েছে সরকার।
অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সোমবার (১৯ অক্টোবর) জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির একজন অভিবাসী শ্রমিক এবং অন্যজন ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাদের একজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, অন্যজনের বগুড়ায়। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আকাশপথে যোগাযোগ ও সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সেই তথ্যের ভিত্তিতে দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া, কনস্যুলার অধিকার এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন














