বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দি আবার সরগরম, সুখ্যাতি রয়েছে বিদেশেও
- আপডেট সময় : ০৫:৪২:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
- / ১০ বার পড়া হয়েছে
রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ। বৈশাখ মাসকে কেন্দ্র করে ব্যস্ততা বেড়েছে বাঁশির কারিগরদের। তাদের দম ফেলার সময় নেই। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে পাইকাররা ভিড় করছেন বাঁশির গ্রামে।
কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ছোট্ট গ্রাম শ্রীমদ্দি। শ্রীমদ্দি গ্রামটি মানুষের কাছে সুপরিচিত ‘বাঁশির গ্রাম’ হিসেবে। গ্রামটিতে প্রায় ৪০টি বাঁশি কারিগর পরিবারের বসবাস। শ্রীমদ্দি গ্রামে বাঁশি তৈরির ঐতিহ্য শত বছরেরও বেশি। বংশপরম্পরায় পূর্বপুরুষদের এই সৃষ্টিশীল কাজ ধরে রেখেছেন তারা। এখানে তৈরি বাঁশি সরবরাহ করা হয় সারা দেশে।
সারা বছর কিছুটা চাহিদা থাকলেও বৈশাখে এর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কাল বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এ উপলক্ষে দেশব্যাপী বসে মেলা। আর সেই মেলার অন্যতম আকর্ষণ বাঁশের বাঁশি। তাই এখন বাঁশি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সব বয়সী নারী-পুরুষ কারিগরেরা।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, দেশের মোট উৎপাদিত বাঁশির প্রায় ৭০ শতাংশই তৈরি হয় শ্রীমদ্দি গ্রামে। গ্রামটির এই শিল্পের ঐতিহ্য প্রায় একশ থেকে সোয়া শ বছরের। শুধু টিকে থাকাই নয়, শ্রীমদ্দি গ্রামের কারুশিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি বাঁশি এখন যাচ্ছে দেশের বাইরেও।
বাঁশি কারিগররা জানান, কাল থেকেই শুরু হবে বৈশাখী মেলা, যা চলবে প্রায় পক্ষকাল। তারা আশা করছেন, তাদের তৈরি প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার বাঁশি সারা দেশে বিক্রি হবে—যদি কোনো দুর্বিপাক না ঘটে। সেই বিক্রির আশায় তারা নতুন স্বপ্ন বুনছেন। সারা বছর ধারদেনা ও এনজিও কিংবা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কাঁচামাল কিনে বাঁশি তৈরি করেন। বৈশাখের বিক্রির মাধ্যমেই তারা পুঁজি ও লাভ ফেরত পাওয়ার আশা করেন।
সরেজমিনে শ্রীমদ্দির অনিল দাসের বাড়িতে দেখা যায়, বাড়ির নারী-পুরুষ, এমনকি গৃহবধূরাও একসঙ্গে বাঁশিতে রং করছেন। কেউ ছোট ছোট করে মুলি বাঁশ কাটছেন, কেউ সিক দিয়ে ছিদ্র করছেন, কেউ আগুনের ছেঁকা দিয়ে নকশা করছেন, আবার কেউ রংতুলিতে সেই নকশা ফুটিয়ে তুলছেন।
বাঁশিতে রং করছিলেন গৃহবধূ মৌসুমী, যিনি নবম শ্রেণির ছাত্রী। তিনি জানান, বাঁশি তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমেই তাদের সংসার চলে। তবে শুধু জীবিকার জন্য নয়, ভালোবাসা থেকেও তারা এই কাজ করেন।
প্রবীণ কারিগর জয়নাল জানান, শ্রীমদ্দির অন্তত ৪০টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। পরিবারের সব বয়সের নারী, পুরুষ ও শিশুরা কোনো না কোনো ধাপে বাঁশি তৈরিতে অংশ নেয়। সুনীল বিশ্বাসের স্ত্রী ঝর্ণা বিশ্বাস জানান, একটি বাঁশি তৈরিতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪টি ধাপ রয়েছে। এটি মূলত মুলি বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় এবং বাঁশিগুলোর দৈর্ঘ্য ১৩ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও ভারতীয় সীমান্ত এলাকা থেকে সরু মুলি বাঁশ সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে এসব বাঁশ রোদে শুকানো হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বাছাই করে মসৃণ করে মাপমতো কাটা হয়। কারিগররা মোহন বাঁশি, নাগিনী বাঁশি, মুখ বাঁশি, আড় বাঁশিসহ নানা ধরনের বাঁশি তৈরি করেন। এসব বাঁশির দাম মান ও নকশাভেদে ৫ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বাঁশির কারিগর যতীন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস গর্বের সঙ্গে জানান, শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশি দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, জাপান, সিঙ্গাপুর, ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানও সহায়তা প্রদান করছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন
































