সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল
- আপডেট সময় : ১২:৫৩:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৫৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি)’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিন’বারের সফল ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রি খালেদা জিয়া মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি স্বাধীনতার মহান ঘোষক ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) এর সহধর্মিনী ছিলেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ৭৯ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করলেন। এসময় হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ছেলের বউ ডা. জোবায়দা রহমান, পুতনী জাইমা রহমান, ছোট ছেলের বউ শার্মিলী রহমান সিঁথি, ছোট ভাই শামীম এসকান্দার, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ সকল আত্মীয় স্বজন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সকল চিকিৎসকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার বিশেষ সভা ডাকেন সভায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন ও তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন মোনাজাত পরিচালনা করেন। সভায় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আগামীকাল থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা ও আগামীকাল এক দিনের সাধারণ ছুটির সিদ্ধান্ত হয়। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সারাদেশে মাতম পরিস্থিতের সৃষ্টি হয়। সারাদেশের মানষ শোকে ম্যুহমান হয়ে পড়ে। দেশের জেলা ও উপজেলা বিএনপি অফিসগুলিতে জনতার ভীড় দেখা দেয় এসময় সকলেই আহাজারী ও কান্না করতে থাকেন। এসময় অনেককে দোয়া করতে দেখা যায়। এদিন সারাদেশ শোকের ছায়ায় ঢেকে যায়। দেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই বরেণ্য রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে জাতি এক মহান অভিভাবককে হারালো। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের আভা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। অবশেষে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে মামলা–মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ- এসবও তাঁদের জীবনে অভাবনীয় নয়। বিশেষ করে বিগত ভারতীয় আধিপত্যবাদি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার খালেদা জিয়া’কে অবর্ণনীয় নির্যাতন করেতোঁকে মৃত্যুর দুয়ারে পর্যন্ত নিয়ে ঠেলে দিয়েছেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের নির্দয় ও চরম পর্যায়ের ভয়াবহ সব নির্যাতন সহ্য করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। সহ্য করেছেন স্বামী–সন্তান হারানোর গভীর শোকসন্তাপ, আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা। রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব–সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু। জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমেই তিনি দলের শীর্ষপদ পাননি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিজের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছর দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার দক্ষ রাজনৈতিক হিসাবে উত্থান স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল ৭–দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ শীর্ষক এক দফা আন্দোলন শুরু করেন।
তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চড়াই-উতরাইয়ের পথ পেরিয়ে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে অনেকেরই পূর্বানুমান ছিল তাঁর বিরোধী পক্ষই বিজয়ী হবে; কিন্তু সেসব অনুমান মিথ্যায় পর্যবসিত করে দীর্ঘ আট বছরের অবিরাম, নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর বিএনপির বিজয় তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নহীন করে তোলে। দেশের প্রথম ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছেন। কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি। তাঁর এক জীবনীকার বলেছেন, ‘দেশের সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন।’ খালেদা জিয়া জীবনের নানা পর্যায়ে বেশ অনেকটা সময় বন্দিত্বের নির্যাতনের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ জুলাই থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সেনানিবাসে বন্দী ছিলেন। জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর ১৯৮১ সালে সেনানিবাসের বাড়িতে তাঁকে কিছুদিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে আলোচিত কালপর্বে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল সড়কের বাড়িতে গৃহবন্দী করা হয়। পরে সেখান থেকে সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে সাবজেল ঘোষণা করে এক বছর সাত দিন তাঁকে বন্দী রাখা হয়। পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরোনো কারাগারে বন্দিত্বের কঠিন সময় কেটেছে খালেদা জিয়ার জীবনে। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ‘ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা’ করা হয়। গ্রেপ্তার করে এই নির্জন স্থাপনাটিতে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে তাঁকে বন্দী রাখা হয়। এ মামলায় তাঁকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে স্লো পয়জনিংয়ের অভিযোগ ওঠে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার বিদেশে চিকিৎসার আবেদন করেও অনুমতি পাননি। মানবিক কারণে ২০২০ সালে তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকার শর্তে কারাগার থেকে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। গত বছর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড মওকুফ করে মুক্তি দেওয়া হয়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে, বিগত ভারতীয় আধিপত্যবাদি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার খালেদা জিয়া’কে সঠিক চিকিৎসা নিতে দেয়নি সর্বক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা হয়েছে। এমনকি মিথ্যার মামলা দিয়ে তাঁকে কারা অন্তরীন করে চিকিৎসায় বিভিন্ন বাঁধা সৃষ্টি করেছেন। মূলত চিকিৎসা ক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বৈরীতা বেগম খালেদা জিয়া’কে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ডাক্তাররা খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরামর্শ দিলে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তেলে বেগুনে জ্বলেউঠে বলেন খালেদা জিয়া’র আহ্লাদ কত ? মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছর ৭ জানুয়ারি লন্ডনে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর স্বাস্থ্যের অনেকটা উন্নতি হয়েছিল। তবে নানা রোগে জটিলতা ও শরীর–মনে ধকল সহ্য করে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও ছিল প্রতিকূল। প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন। হাসপাতালে ভর্তি করানো হতো।
গত ২৩ নভেম্বর এমনই পর্যায়ে তাঁকে শেষবারের মতো রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক মাসের কিছু বেশি সময় তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। এবার তিনি আর চিকিৎসায় সাড়া দিতে পারলেন না। ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন তাঁর প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।
সংবাদটি শেয়ার করুন

























