স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন বিদেশে, ফিরছেন লাশ হয়ে—অজানা এক করুণ গল্প
- আপডেট সময় : ১০:৪৮:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
- / ৬০ বার পড়া হয়েছে
গত ২০ মার্চ কিরগিজস্তানের সোকুলুক শহরে কর্মস্থলে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল খায়ের (৪২)। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারজুড়ে।
ছোট্ট আরহামের জন্মের আগেই জীবিকার তাগিদে কিরগিজস্তানে পাড়ি জমান তার বাবা আবুল খায়ের। তাই বাবাকে কখনো ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়নি তার। দূরদেশে থাকা বাবার সঙ্গে ভিডিও কলেই গড়ে উঠছিল সম্পর্ক। এখন আরহামের বয়স মাত্র ১৫ মাস। আধো আধো কণ্ঠে ‘বাবা, বাবা’ ডাকা শেখার মধ্যেই হারিয়ে গেল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন খায়ের। বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। অভাব-অনটনের মধ্যেই বেড়ে ওঠা খায়ের সংসারের হাল ধরতে ২০২৪ সালের জুন মাসে, বিয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় পাড়ি জমান কিরগিজস্তানে।
বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রায় ৪ লাখ টাকা জোগাড় করতে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড় শতাংশ জমিও বিক্রি করে দেন। পাশাপাশি ঋণও নিতে হয় তাকে। কিন্তু বিদেশে গিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। নির্ধারিত কাজ না পেয়ে যখন যা পেয়েছেন, তাই করেছেন। বেশিরভাগ সময়ই কর্মহীন থাকতে হয়েছে তাকে।
সবশেষে সোকুলুক শহরের একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন খায়ের। সেখানে প্রায় এক মাস কাজ করার পর ২০ মার্চ দুপুরে কাজ করার সময় হঠাৎ মাটির স্তূপ ধসে পড়ে তার ওপর। সহকর্মীরা উদ্ধার করার আগেই ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কিরগিজস্তানে যাওয়ার আগে খায়ের কিছুদিন সৌদি আরবেও ছিলেন। পরে দেশে ফিরে প্রায় দেড় বছর অবস্থান করেন। এরপর ফেসবুকে একটি বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকার বনানী এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে কিরগিজস্তানে যান।
এজেন্সি থেকে সিরামিক কারখানায় কাজ দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে গিয়ে সেই কাজ পাননি। ফলে বিদেশে গিয়েও হতাশায় ভুগছিলেন তিনি।
বর্তমানে বড় ভাই রফিক মিয়ার জায়গায় ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস করছেন খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার ও তার শিশু সন্তান। এই ঘরটি আমার জায়গায় করতে দিয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি তাকে লালন পালন করে আসছি। আমরা তিন ভাই একসাথেই থাকতাম। আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে খায়ের সবার ছোট।
স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হামিদা আক্তার বলেন,
‘ঘটনার দিন সকালে খায়ের ফোন করেছিল। বলেছিল কাজে যাবে না। পরে আবার ফোন করে ছেলেকে দেখেছে। এরপর বিকেলে ফোন দিলে একজন সহকর্মী রিসিভ করে জানায়, কাজের সময় বুকে ব্যথা পেয়ে মারা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
খায়েরের বড় ভাই রফিক মিয়া জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে গিয়েছিলেন খায়ের। বর্তমানে তার স্ত্রী-সন্তানের আশ্রয়ও অন্যের জায়গায়। তিনি বলেন, ‘কিরগিজস্তানে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। ইটভাটার মালিকপক্ষ মরদেহ দেশে পাঠানোর কথা বলেছে। তবে কবে পাঠাবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।’ তবে আনুমানিক তারিখ বলেছে আগামী ৪ অথবা ৫ এপ্রিলের মধ্যে পাঠানোর ব্যবস্থা হতে পারে। এখনও তার ঋণ আছে। তার স্ত্রী-সন্তানের এখন কী অবস্থা হবে, তারা কীভাবে চলবে- কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে দাবি জানাই অন্তত খায়েরের স্ত্রী-সন্তানের জন্য যেন কিছু একটা করে।’
খায়েরের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে মরদেহ দ্রুত দেশে আনা এবং তার স্ত্রী-সন্তানের জন্য সহায়তার দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া বলেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়নি। যোগাযোগ করলে আমরা মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
সংবাদটি শেয়ার করুন


























