ঢাকা ০৮:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাত মাসের অপেক্ষার অবসান, ফিরলেন না মানুষটি, ফিরল শুধু নিথর দেহ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইউএনও নির্বাচিত হলেন আশুগঞ্জের রাফে মোহাম্মদ ছড়া  আখাউড়ায় সাংবাদিকদের সাথে মেয়র প্রার্থী মিশনের মতবিনিময় জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপির দোয়া মাহফিল ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ঈদের দিনেও মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো বাতিঘর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, ভাইরাল ভিডিও ঘিরে আলোচনা জেলা পরিষদর প্রশাসক  আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম সিরাজ এর ঈদ শুভেচ্ছা শাহ্ মোঃ ইব্রাহিম মিয়ার পক্ষ থেকে ঈদ মোবারক লন্ডনে কবীর আহমেদ ভূঁইয়ার জন্মদিন পালন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে নেতাকর্মীদের মিলনমেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেপটিক ট্যাংকে নেমে চার শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু

সরকার যদি উন্নত চিকিৎসা করিয়ে অন্তত একটা চোখও ভালো করতে পারত তাহলেও ছেলের জীবনটা চলত

প্রতিনিধির নামঃ
  • আপডেট সময় : ০২:০৬:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৫
  • / ৩৪৯ বার পড়া হয়েছে

সালমা আহমেদ, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রতিনিধি:

গত বছরের ১৮ জুলাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মাধবদী এলাকায় যান আজিজুল হক। একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে গুরুতর আহত হন। তার দুই চোখে ও মুখের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগে।

মা’র হাত ধরে চোখে কালো চশমা দিয়ে হাটতে হাটতে আজিজুলের বাবা আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, -“৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড দিছে সরকার।হের লাইগ্যা কি আমার পুলায় নতুন কইরা দেশ স্বাধীন করাইতে আন্দোলন করছিলো? পুলিশের গুলি খাইছিলো? পুলার জন্য ট্যাহা(টাকা) চাইনা,ভালো চিকিৎসা চাই”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তেজখালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের দরিদ্র কৃষক কামাল মিয়ার ছেলে আজিজুল হক। নরসিংদী’র মাধবদী এলাকার পৌনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বড় ভাইয়ের ২০২০ সালে মৃত্যু হয়। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় নরসিংদীর মাধদীর দেবজানি টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন আজিজুল। সংসারের খরচ, বাবার চিকিৎসা ও ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচ বহন করতেন তিনি।

পিতা কামাল মিয়া জানান, গত বছরের ১৮ জুলাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মাধবদী এলাকায় যান আজিজুল হক। একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে গুরুতর আহত হন। তার দুই চোখে ও মুখের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগে। প্রথমে তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেওয়া হয়। এরপর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। আহত হওয়ার পর চিকিৎসার খরচ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবরা জুগিয়েছেন।

পবিরারের অসচ্ছলতার কারণে বড় ভাইয়ের সঙ্গে নরসিংদী চলে আসেন। মাধবদী এমদাদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে টেক্সটাইল মিলে চাকরি নেন। দাখিল পাস করার পর মাধবদী পৌনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। চাকরি করে মাসে ১৮ হাজার টাকা আয় করতেন। এই টাকার বেশিরভাগই সংসার চালাতে বাবাকে দিয়ে দিতেন। এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতার কারণে পরিবারের নেমে এসেছে চরম অন্ধকার।

আজিজুল হক বলেন, স্বৈরাচার হটিয়ে বিপ্লবী সরকার এনেছি। কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নিচ্ছে না। তখন আশ্বাস দিয়েছে চোখের চিকিৎসা করাবে। এখন পর্যন্ত আমাকে সরকারের পক্ষ থেকে কিংবা সমন্বয়কও এসে দেখেনি। শুনেছি জুলাই বিপ্লব ফাউন্ডেশন থেকে অনেকে সহায়তা পাচ্ছে। আমি কিছুই পেলাম না। বেঁচেও যেন মৃত, পরিবারের বোঝা হয়ে আছি।চলতে ফিরতে কষ্ট হয়।কারো সহায়তা ছাড়া কোথাও যেতে পারিনা।

আজিজুলের মা শুকতারা বেগম বলেন, সংসার চালানো অনেক কষ্ট, এখন ছেলেরে কীভাবে চিকিৎসা করাবো?পাড়া-প্রতিবেশী সহযোগিতা করছে। বড় ছেলে মারা গেছে তারপর এই ছেলেই সংসার চালাতো। আমার সেই ছেলেরই এখন পরের সাহায্যে চলতে হয়। সরকার যদি উন্নত চিকিৎসা করিয়ে অন্তত একটা চোখও ভালো করতে পারত, তাহলেও ছেলের জীবনটা চলত।

আজিজুলের বাবা কামাল মিয়া আরো বলেন, আমার এই ছেলেই পরিবারের অবলম্বন ছিল। সে ঘরে অন্ধ হয়ে বসে আছে। সে তো মরা মানুষের মতো পড়ে আছে। সরকারি কোনো সহযোগিতাও পেলাম না। অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছি। প্রাইজবন্ড দিয়ে কি হবে,আমার ছেলের উন্নত চিকিৎসা দরকার।আমাদের টাকার চেয়ে চিকিৎসা জরুরি।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি মো.মাইনুদ্দিন বলেন,’আমরা আজিজুলের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি।তাকে প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসা দেয়া হোক’।

আজ (মঙ্গলবার) বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা আজিজুলের বিষয়ে বলেন, “আমরা আজিজুল সহ উপজেলার ৫ জনকে সরকারের তরফ থেকে প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড দিয়েছি।যারা গত বছরের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জুলাই ফাউন্ডেশনের থেকে যেনো সহায়তা পায় সে জন্য আজিজুল সহ মোট ৫ জনের নামের তালিকা জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে “।

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

সরকার যদি উন্নত চিকিৎসা করিয়ে অন্তত একটা চোখও ভালো করতে পারত তাহলেও ছেলের জীবনটা চলত

আপডেট সময় : ০২:০৬:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৫

সালমা আহমেদ, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রতিনিধি:

গত বছরের ১৮ জুলাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মাধবদী এলাকায় যান আজিজুল হক। একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে গুরুতর আহত হন। তার দুই চোখে ও মুখের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগে।

মা’র হাত ধরে চোখে কালো চশমা দিয়ে হাটতে হাটতে আজিজুলের বাবা আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, -“৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড দিছে সরকার।হের লাইগ্যা কি আমার পুলায় নতুন কইরা দেশ স্বাধীন করাইতে আন্দোলন করছিলো? পুলিশের গুলি খাইছিলো? পুলার জন্য ট্যাহা(টাকা) চাইনা,ভালো চিকিৎসা চাই”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তেজখালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের দরিদ্র কৃষক কামাল মিয়ার ছেলে আজিজুল হক। নরসিংদী’র মাধবদী এলাকার পৌনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বড় ভাইয়ের ২০২০ সালে মৃত্যু হয়। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় নরসিংদীর মাধদীর দেবজানি টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন আজিজুল। সংসারের খরচ, বাবার চিকিৎসা ও ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচ বহন করতেন তিনি।

পিতা কামাল মিয়া জানান, গত বছরের ১৮ জুলাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মাধবদী এলাকায় যান আজিজুল হক। একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে গুরুতর আহত হন। তার দুই চোখে ও মুখের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগে। প্রথমে তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেওয়া হয়। এরপর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। আহত হওয়ার পর চিকিৎসার খরচ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবরা জুগিয়েছেন।

পবিরারের অসচ্ছলতার কারণে বড় ভাইয়ের সঙ্গে নরসিংদী চলে আসেন। মাধবদী এমদাদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে টেক্সটাইল মিলে চাকরি নেন। দাখিল পাস করার পর মাধবদী পৌনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। চাকরি করে মাসে ১৮ হাজার টাকা আয় করতেন। এই টাকার বেশিরভাগই সংসার চালাতে বাবাকে দিয়ে দিতেন। এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতার কারণে পরিবারের নেমে এসেছে চরম অন্ধকার।

আজিজুল হক বলেন, স্বৈরাচার হটিয়ে বিপ্লবী সরকার এনেছি। কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নিচ্ছে না। তখন আশ্বাস দিয়েছে চোখের চিকিৎসা করাবে। এখন পর্যন্ত আমাকে সরকারের পক্ষ থেকে কিংবা সমন্বয়কও এসে দেখেনি। শুনেছি জুলাই বিপ্লব ফাউন্ডেশন থেকে অনেকে সহায়তা পাচ্ছে। আমি কিছুই পেলাম না। বেঁচেও যেন মৃত, পরিবারের বোঝা হয়ে আছি।চলতে ফিরতে কষ্ট হয়।কারো সহায়তা ছাড়া কোথাও যেতে পারিনা।

আজিজুলের মা শুকতারা বেগম বলেন, সংসার চালানো অনেক কষ্ট, এখন ছেলেরে কীভাবে চিকিৎসা করাবো?পাড়া-প্রতিবেশী সহযোগিতা করছে। বড় ছেলে মারা গেছে তারপর এই ছেলেই সংসার চালাতো। আমার সেই ছেলেরই এখন পরের সাহায্যে চলতে হয়। সরকার যদি উন্নত চিকিৎসা করিয়ে অন্তত একটা চোখও ভালো করতে পারত, তাহলেও ছেলের জীবনটা চলত।

আজিজুলের বাবা কামাল মিয়া আরো বলেন, আমার এই ছেলেই পরিবারের অবলম্বন ছিল। সে ঘরে অন্ধ হয়ে বসে আছে। সে তো মরা মানুষের মতো পড়ে আছে। সরকারি কোনো সহযোগিতাও পেলাম না। অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছি। প্রাইজবন্ড দিয়ে কি হবে,আমার ছেলের উন্নত চিকিৎসা দরকার।আমাদের টাকার চেয়ে চিকিৎসা জরুরি।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি মো.মাইনুদ্দিন বলেন,’আমরা আজিজুলের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি।তাকে প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসা দেয়া হোক’।

আজ (মঙ্গলবার) বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা আজিজুলের বিষয়ে বলেন, “আমরা আজিজুল সহ উপজেলার ৫ জনকে সরকারের তরফ থেকে প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড দিয়েছি।যারা গত বছরের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জুলাই ফাউন্ডেশনের থেকে যেনো সহায়তা পায় সে জন্য আজিজুল সহ মোট ৫ জনের নামের তালিকা জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে “।