ঢাকা ০৪:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিখোঁজের দুইদিন পর স্কুলছাত্রীর বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা প্রবর্তক একাডেমি ও ঢেউ আয়োজিত আনন্দ শোভাযাত্রা যেমন খুশি তেমন সাজে লোকজ পুরস্কার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজকে গণসংবর্ধনা খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার নতুন ওসি আবু তাহের দেওয়ান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঞ্ছারামপুর পামওয়েল কে নামী ব্রান্ডের সোয়াবিন তেল হিসেবে বিক্রি অভিযানে ১ লাখ টাকা জরিমানা নবীনগরে নিম্নমানের সড়ক নির্মাণ নিয়ে বিরোধ: প্রকৌশলীকে তাড়া ও মারধর, মামলায় ঠিকাদারের ম্যানেজার গ্রেপ্তার আখাউড়ায় নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয় আসনে জমজমাট লড়াই

বিএনপি–জোট–বিদ্রোহীদের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটের অঙ্কে নতুন সমীকরণ

আবু নাছের রতন
  • আপডেট সময় : ০৮:১৫:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ২১২ বার পড়া হয়েছে

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনে ভোটের লড়াই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৬টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ৪৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।জেলায় মোট ভোটার ২৬ লাখ ৮ হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪০ জন এবং নারী ভোটার ১২ লাখ ৪১ হাজার ৭৩১ জন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বে সমমনা ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ছয় আসনে এনসিপির দুজন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপরদিকে বিএনপি ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে নিজ দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, বাকি দুটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে শরিক দলগুলোর জন্য। তবে প্রধান দুই জোটের প্রার্থীদের ভিড়ে পিছিয়ে নেই দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও মাঠপর্যায়ে তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার প্রতিটি আসনেই বদলে গেছে দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক সমীকরণ। গতকাল ছিল প্রচার-প্রচারণার শেষ দিন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছয় আসনেই প্রার্থী ও সমর্থকদের গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠকে মুখর ছিল পুরো জেলা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) হাওর বেষ্টিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৪৬ হাজার ২৬৯ জন পুরুষ, এক লাখ ২৯ হাজার ৩৫৭ জন নারী ও তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রার্থী।

এই আসনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে অতীতে জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় এখানকার ভোটারদের স্বাধীন মনোভাবের পরিচয় দেয়। এবার বিএনপি প্রার্থী আবদুল হান্নান প্রথমবারের মতো ধানের শীষের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে ভোটের মাঠ বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

সাবেক তিন ইউপি চেয়ারম্যান ও জামায়াতের প্রার্থী এই চারজন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যেই ভোটের মূল লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এ চারজন হলেন ধানের শীষ প্রতীকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এম এ হান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ঘোড়া প্রতীকের অ্যাডভোকেট এ কে এম কামরুজ্জামান মামুন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কলার ছড়ি প্রতীকের মো. ইকবাল চৌধুরী এবং দাঁড়িপাল্লার প্রতীকে জামায়াতের আমিনুল ইসলাম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দু ভোটারদের অবস্থান এখানে ফল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল–আশুগঞ্জ) জেলার (সরাইল–আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৬৫ হাজার ২৪৫ জন পুরুষ, দুই লাখ ৩৪ হাজার ২০১ জন নারী ও দুইজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করছেন ৯ জন প্রার্থী। তবে এখানে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিএনপির ঐতিহ্যবাহী এই আসনটি এবার জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (হাঁস) ও তরুণ দে (কলার ছড়ি) শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও এস এন তরুণ দে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ানোয় চরম চাপের মুখে পড়েছেন জোট সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। প্রায় ৮০ হাজারের বেশি হিন্দু ভোটার থাকায় এই আসনে তাদের ভোটই হতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর–বিজয়নগর)
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছয় লাখ ২৪ হাজার ৬০১ জন। এর মধ্যে তিন লাখ ২৮ হাজার ১৮২ জন পুরুষ এবং দুই লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ জন নারী ভোটার রয়েছেন। এই আসনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজনৈতিকভাবে আসনটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। আশির দশকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও নব্বইয়ের দশক থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আধিপত্য দেখা গেছে। এ সময়ের মধ্যে বিএনপি টানা চারবার এবং আওয়ামী লীগও চারবার করে জয় পেয়েছে, ফলে ভোটের অঙ্কে দুই দলই শক্ত অবস্থানে ছিল।
তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার আসনটি কার্যত আওয়ামী লীগশূন্য। এই পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের তরুণ প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি ফাঁকা মাঠের সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। জেলার সবচেয়ে বেশি ভোটারসংখ্যার এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এগিয়ে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিমত।
এ আসনে ভোটারদের প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে যানজট নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সদর হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা–আখাউড়া) এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪৩ হাজার ৯০৯ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৪৭ জন পুরুষ, দুই লাখ ১৩ হাজার ২৫৬ জন নারী ও ছয়জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

কসবা ও আখাউড়া নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মুশফিকুর রহমান ও জামায়াতের আতাউর রহমান সরকারের মধ্যে মূল লড়াই হচ্ছে। বিএনপি প্রার্থী সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকলেও জামায়াত ইউনিয়নভিত্তিক প্রচারণায় ভালো সাড়া পাচ্ছে। এখানে মোট ৭জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৭৪ হাজার ৮২৬ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৭ জন পুরুষ, দুই লাখ ২৬ হাজার ৮৫ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এ আসনটিতে মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।

এখানে বিএনপি প্রার্থী আবদুল মান্নানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন। বাবার পুরনো ভোটব্যাংক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে তিনি শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ভোটারদের মতে, ধানের শীষ ও ফুটবল প্রতীকের মধ্যেই মূল লড়াই হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৪ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার ২৬০ জন পুরুষ, এক লাখ ৪২ হাজার ৪১৩ জন নারী ও একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

এই আসনে জোট প্রার্থী গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও স্বতন্ত্র (বিএনপি বহিষ্কৃত) ড. সাইদুজ্জামান কামালের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এখানে মোট প্রার্থী রয়েছে ১০ জন।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনেই ভেঙে গেছে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটের সমীকরণ। ফলে ভোটাররা এবার নতুন করে অবস্থান নির্ধারণে ব্যস্ত। কোথাও বিএনপির একক প্রভাব দৃশ্যমান, কোথাও দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের অঙ্ককে জটিল করে তুলেছে। আবার কোনো কোনো আসনে সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও এবারের নির্বাচন ঘিরে জেলায় বিরাজ করছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও হিসাব-নিকাশের ব্যস্ততা।

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয় আসনে জমজমাট লড়াই

বিএনপি–জোট–বিদ্রোহীদের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটের অঙ্কে নতুন সমীকরণ

আপডেট সময় : ০৮:১৫:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনে ভোটের লড়াই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৬টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ৪৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।জেলায় মোট ভোটার ২৬ লাখ ৮ হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪০ জন এবং নারী ভোটার ১২ লাখ ৪১ হাজার ৭৩১ জন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বে সমমনা ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ছয় আসনে এনসিপির দুজন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের একজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপরদিকে বিএনপি ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে নিজ দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, বাকি দুটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে শরিক দলগুলোর জন্য। তবে প্রধান দুই জোটের প্রার্থীদের ভিড়ে পিছিয়ে নেই দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও মাঠপর্যায়ে তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার প্রতিটি আসনেই বদলে গেছে দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক সমীকরণ। গতকাল ছিল প্রচার-প্রচারণার শেষ দিন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছয় আসনেই প্রার্থী ও সমর্থকদের গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠকে মুখর ছিল পুরো জেলা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) হাওর বেষ্টিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৭৫ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৪৬ হাজার ২৬৯ জন পুরুষ, এক লাখ ২৯ হাজার ৩৫৭ জন নারী ও তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রার্থী।

এই আসনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে অতীতে জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় এখানকার ভোটারদের স্বাধীন মনোভাবের পরিচয় দেয়। এবার বিএনপি প্রার্থী আবদুল হান্নান প্রথমবারের মতো ধানের শীষের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে ভোটের মাঠ বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

সাবেক তিন ইউপি চেয়ারম্যান ও জামায়াতের প্রার্থী এই চারজন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যেই ভোটের মূল লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এ চারজন হলেন ধানের শীষ প্রতীকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এম এ হান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ঘোড়া প্রতীকের অ্যাডভোকেট এ কে এম কামরুজ্জামান মামুন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কলার ছড়ি প্রতীকের মো. ইকবাল চৌধুরী এবং দাঁড়িপাল্লার প্রতীকে জামায়াতের আমিনুল ইসলাম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দু ভোটারদের অবস্থান এখানে ফল নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল–আশুগঞ্জ) জেলার (সরাইল–আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৬৫ হাজার ২৪৫ জন পুরুষ, দুই লাখ ৩৪ হাজার ২০১ জন নারী ও দুইজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করছেন ৯ জন প্রার্থী। তবে এখানে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিএনপির ঐতিহ্যবাহী এই আসনটি এবার জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (হাঁস) ও তরুণ দে (কলার ছড়ি) শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও এস এন তরুণ দে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ানোয় চরম চাপের মুখে পড়েছেন জোট সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। প্রায় ৮০ হাজারের বেশি হিন্দু ভোটার থাকায় এই আসনে তাদের ভোটই হতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর–বিজয়নগর)
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছয় লাখ ২৪ হাজার ৬০১ জন। এর মধ্যে তিন লাখ ২৮ হাজার ১৮২ জন পুরুষ এবং দুই লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ জন নারী ভোটার রয়েছেন। এই আসনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজনৈতিকভাবে আসনটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। আশির দশকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও নব্বইয়ের দশক থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আধিপত্য দেখা গেছে। এ সময়ের মধ্যে বিএনপি টানা চারবার এবং আওয়ামী লীগও চারবার করে জয় পেয়েছে, ফলে ভোটের অঙ্কে দুই দলই শক্ত অবস্থানে ছিল।
তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার আসনটি কার্যত আওয়ামী লীগশূন্য। এই পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের তরুণ প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি ফাঁকা মাঠের সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। জেলার সবচেয়ে বেশি ভোটারসংখ্যার এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এগিয়ে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিমত।
এ আসনে ভোটারদের প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে যানজট নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সদর হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা–আখাউড়া) এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪৩ হাজার ৯০৯ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৪৭ জন পুরুষ, দুই লাখ ১৩ হাজার ২৫৬ জন নারী ও ছয়জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

কসবা ও আখাউড়া নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মুশফিকুর রহমান ও জামায়াতের আতাউর রহমান সরকারের মধ্যে মূল লড়াই হচ্ছে। বিএনপি প্রার্থী সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকলেও জামায়াত ইউনিয়নভিত্তিক প্রচারণায় ভালো সাড়া পাচ্ছে। এখানে মোট ৭জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৭৪ হাজার ৮২৬ জন। এর মধ্যে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৭ জন পুরুষ, দুই লাখ ২৬ হাজার ৮৫ জন নারী ও চারজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। এ আসনটিতে মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন।

এখানে বিএনপি প্রার্থী আবদুল মান্নানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন। বাবার পুরনো ভোটব্যাংক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে তিনি শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ভোটারদের মতে, ধানের শীষ ও ফুটবল প্রতীকের মধ্যেই মূল লড়াই হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৪ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার ২৬০ জন পুরুষ, এক লাখ ৪২ হাজার ৪১৩ জন নারী ও একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

এই আসনে জোট প্রার্থী গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও স্বতন্ত্র (বিএনপি বহিষ্কৃত) ড. সাইদুজ্জামান কামালের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এখানে মোট প্রার্থী রয়েছে ১০ জন।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনেই ভেঙে গেছে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটের সমীকরণ। ফলে ভোটাররা এবার নতুন করে অবস্থান নির্ধারণে ব্যস্ত। কোথাও বিএনপির একক প্রভাব দৃশ্যমান, কোথাও দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের অঙ্ককে জটিল করে তুলেছে। আবার কোনো কোনো আসনে সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও এবারের নির্বাচন ঘিরে জেলায় বিরাজ করছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও হিসাব-নিকাশের ব্যস্ততা।