ঢাকা ০২:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা বিএনপির ১৪ ইউনিটের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলামের সৌজন্য সাক্ষাৎ তিতাসের বুকে দুই বছর পর নৌকা বাইচ, অর্ধলক্ষাধিক দর্শকের উচ্ছ্বাস বিজয়নগর মডেল প্রেসক্লাবের কমিটি গঠন সভাপতি মাইনুদ্দিন রুবেল,সাধারণ সম্পাদক এস এম টিপু চৌধুরী পলিথিন বর্জনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পরিষদ প্রশাসকের সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেড ক্রিসেন্ট নির্বাচনে শাহীন ভাইস চেয়ারম্যান, মিজানুর রহমান সেক্রেটারি বণিকপাড়ার সড়কে জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে চরম দুর্ভোগে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা জেলা পরিষদ প্রশাসককে নোঙর বাংলাদেশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার ফুলেল শুভেচ্ছা আনন্দ মিছিল মৎস্য অবমুক্তকরণ ও বৃক্ষরোপণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নদী-প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় নোঙর বাংলাদেশের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এমপির

বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শিক্ষকতার প্রতীক মাসুকা বেগম নিপুর: শেষ ইচ্ছায় সোহাগপুরে চিরনিদ্রা

আবু নাছের (রতন), আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া
  • আপডেট সময় : ০৪:৪২:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫
  • / ৬৬৫ বার পড়া হয়েছে

বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শিক্ষকতার প্রতীক মাসুকা বেগম নিপুর: শেষ ইচ্ছায় সোহাগপুরে চিরনিদ্রা

রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রাইমারি শাখার ইংরেজি বিভাগের আদর্শ শিক্ষিকা মাসুকা বেগম নিপু (৩৭)। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতি সন্তান এবং শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের প্রিয় মুখ। তার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

গত সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে উত্তরায় বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে মাসুকা বেগম ওই সময় ক্লাস নিচ্ছিলেন। শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। এরপর তাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শরীরের প্রায় ৮৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

মাসুকার কোনো স্বজন দুর্ঘটনার সময় পাশে ছিলেন না। সহকর্মী সাফায়েত ঢালী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করান এবং শেষ পর্যন্ত দেখভাল করেন। মৃত্যুর আগে পাশের বেডে থাকা আরেক শিক্ষককে মাসুকা বলে যান, যেন তার মরদেহ বড় বোনের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে দাফন করা হয়। তার সেই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ীই মরদেহ বড় বোন পাপড়ি রহমানের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সোহাগপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) বাদ আসর আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী, প্রতিবেশী ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নিহত মাসুকা বেগম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের চিলোকুট গ্রামের প্রয়াত সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরীর কনিষ্ঠ কন্যা। তবে তিনি ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছেন শহরের মেড্ডা সবুজবাগ এলাকায়। তিন ভাইবোনের মধ্যে মাসুকা ছিলেন সবার ছোট। মা মারা যাওয়ার পর বাবার সেবা ও সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং প্রায় ৮ বছর ধরে ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করে আসছিলেন।

তার পরিবারের সদস্যরা জানান, দুর্ঘটনার খবর প্রথমে অনলাইনে দেখে পরিবারের এক আত্মীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে তা নিশ্চিত হন। এরপর রাতেই বার্ন ইউনিটে যোগাযোগ করে মাসুকার মৃত্যুর বিষয়টি জেনে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন সবাই।

নিহতের বড় বোনের মেয়ে নিধি বলেন, “খালামনি আমাদের খুব আদর করতেন। কখনো ধমক দিয়ে কথা বলেননি। আমরা শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি—তিনি যেন খালামনিকে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেলেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন।”

বাবা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, “আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে মাসুকা ছিল সবচেয়ে ছোট। মা মারা যাওয়ার পর মেয়েটাই আমার সব দায়িত্ব নিয়েছিল। তাকে বিয়ে দিতে পারিনি। এখন আমি এই শোক কীভাবে সইব?”

মাসুকার সহকর্মীরা বলেন, তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল, বিনয়ী ও শিক্ষার্থীবান্ধব একজন আদর্শ শিক্ষিকা। তার মৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মেধা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগকারী মাসুকা বেগম নিপুর অকাল প্রয়াণে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন ও এলাকাবাসী আজও শোকাহত। তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় শোক প্রকাশ করেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী।

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শিক্ষকতার প্রতীক মাসুকা বেগম নিপুর: শেষ ইচ্ছায় সোহাগপুরে চিরনিদ্রা

আপডেট সময় : ০৪:৪২:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫

বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শিক্ষকতার প্রতীক মাসুকা বেগম নিপুর: শেষ ইচ্ছায় সোহাগপুরে চিরনিদ্রা

রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রাইমারি শাখার ইংরেজি বিভাগের আদর্শ শিক্ষিকা মাসুকা বেগম নিপু (৩৭)। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতি সন্তান এবং শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের প্রিয় মুখ। তার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

গত সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে উত্তরায় বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে মাসুকা বেগম ওই সময় ক্লাস নিচ্ছিলেন। শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। এরপর তাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শরীরের প্রায় ৮৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

মাসুকার কোনো স্বজন দুর্ঘটনার সময় পাশে ছিলেন না। সহকর্মী সাফায়েত ঢালী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করান এবং শেষ পর্যন্ত দেখভাল করেন। মৃত্যুর আগে পাশের বেডে থাকা আরেক শিক্ষককে মাসুকা বলে যান, যেন তার মরদেহ বড় বোনের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে দাফন করা হয়। তার সেই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ীই মরদেহ বড় বোন পাপড়ি রহমানের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সোহাগপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) বাদ আসর আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী, প্রতিবেশী ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নিহত মাসুকা বেগম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের চিলোকুট গ্রামের প্রয়াত সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরীর কনিষ্ঠ কন্যা। তবে তিনি ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছেন শহরের মেড্ডা সবুজবাগ এলাকায়। তিন ভাইবোনের মধ্যে মাসুকা ছিলেন সবার ছোট। মা মারা যাওয়ার পর বাবার সেবা ও সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং প্রায় ৮ বছর ধরে ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করে আসছিলেন।

তার পরিবারের সদস্যরা জানান, দুর্ঘটনার খবর প্রথমে অনলাইনে দেখে পরিবারের এক আত্মীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে তা নিশ্চিত হন। এরপর রাতেই বার্ন ইউনিটে যোগাযোগ করে মাসুকার মৃত্যুর বিষয়টি জেনে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন সবাই।

নিহতের বড় বোনের মেয়ে নিধি বলেন, “খালামনি আমাদের খুব আদর করতেন। কখনো ধমক দিয়ে কথা বলেননি। আমরা শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি—তিনি যেন খালামনিকে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেলেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন।”

বাবা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, “আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে মাসুকা ছিল সবচেয়ে ছোট। মা মারা যাওয়ার পর মেয়েটাই আমার সব দায়িত্ব নিয়েছিল। তাকে বিয়ে দিতে পারিনি। এখন আমি এই শোক কীভাবে সইব?”

মাসুকার সহকর্মীরা বলেন, তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল, বিনয়ী ও শিক্ষার্থীবান্ধব একজন আদর্শ শিক্ষিকা। তার মৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

মেধা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগকারী মাসুকা বেগম নিপুর অকাল প্রয়াণে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন ও এলাকাবাসী আজও শোকাহত। তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় শোক প্রকাশ করেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী।